সৃজনশীল (CQ)
১. গ্রামের দরিদ্র কৃষক লালচান মিয়া। তিনি বিঘে তিনেক জমি বর্গা চাষ করেন। পর-পর দুবছর বন্যা ও খরায় জমিতে ফসল ফলেনি। পরিবারকে দু-বেলা পেট ভরে খেতে দিতে পারেন না। তিনি না খেতে পেয়ে তাঁর সন্তানদের হাড্ডিসার অবস্থা। একটিমাত্র মাটির ঘর, তারও আবার ছাউনি নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বৃষ্টি বাদলার রাতে ঘরের কোণে বসে রাত কাটাতে হয়। লালচান মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না।
- ক) আসমানিদের গ্রামের নাম কী?১
- খ) 'মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি, থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।' এই চরণ দুটি দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে?২
- গ) আসমানিদের ঘরের সাথে লালচান মিয়ার ঘরটির সাদৃশ্য ব্যাখ্যা কর।৩
- ঘ) 'লালচান মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না।' 'আসমানি' কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ কর।৪
উত্তর দেখুন
ক) আসমানিদের গ্রামের নাম রসুলপুর।
খ) চরণ দুটিতে দারুণ অভাব কীভাবে আসমানির মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে, সে কথা বোঝানো হয়েছে।
আসমানির মিষ্টি মুখে একসময় প্রদীপের আলোর মতো হাসি ঝলমল করত। কিন্তু দারুণ অভাব এসে যেন থাপ্পড় মেরে সেই হাসির প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। অনাহারে-অর্ধাহারে, রোগে-শোকে তার জীবন এতটাই দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত যে তার মুখে আর হাসি ফোটে না। মূলত উল্লিখিত চরণ দুটির মাধ্যমে কবি দারিদ্র্যের নির্মমতায় আসমানির হাসিখুশি জীবন হারিয়ে যাওয়ার করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন।
গ) আসমানিদের ঘর এবং লালচান মিয়ার ঘরের মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে যা কবিতার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।
আসমানিদের ঘরটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ, যেখানে একটুখানি বৃষ্টি হলেই পানি গড়িয়ে পড়ে এবং একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, ঠিক তেমনি লালচান মিয়ার ঘরও খুবই ক্ষতিগ্রস্ত; তার ঘরের ছাউনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম, বৃষ্টির রাতে ঘরের কোণে বসে কাটাতে হয়। এই দুই পরিবারের জরাজীর্ণ, নড়বড়ে ঘরের অবস্থা একে অপরের সাথে সাদৃশ্য তৈরি করেছে।
আসমানিরা পেট ভরে খেতে পায় না, অনাহারে তাদের কষ্ট হয়। আসমানির মুখের হাসির প্রদীপ-রাশি অভাবের কারণে নিভে গেছে, আর তাদের বাড়ির পরিবেশও অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর, যেখানে ম্যালেরিয়ার মশা জলে বিষ গুলছে, অথচ সেই জলেই তাদের রান্না-খাওয়া চলে। ঠিক একইভাবে, কৃষক লালচান মিয়া দুই বছর ধরে বন্যা ও খরার কারণে জমিতে ফসল পাননি, ফলে তার পরিবার দুবেলা পেট ভরে খেতে পায় না। তার সন্তানরা না খেতে পেয়ে হাড্ডিসার হয়ে গেছে। উভয় পরিবারই অভাবের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তাদের পক্ষে জীবনের সংগ্রাম অনেক কঠিন।
এই দুই পরিবারের জীবনযাত্রার মধ্যে দৃশ্যমান সাদৃশ্য হচ্ছে দারিদ্র্য, অনাহার এবং সংকটের মধ্যে বেঁচে থাকা, যা তাদের ঘরের অবস্থা এবং জীবনযাত্রার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘ) উদ্দীপকের লালচান মিয়ার মতো মানুষের অভাবের অবস্থা 'আসমানি' কবিতার আসমানিদের জীবনযাত্রার মতোই। কবিতায় আসমানিদের কঠোর জীবনসংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তারা খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের অভাবে নিঃস্ব। তারা পেট ভরে খেতে পায় না, একটুখানি বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি গড়িয়ে পড়ে, নিত্য জ্বর হলেও বৈদ্য ডেকে ওষুধ করার পয়সা নেই, আর আসমানির বাঁশির মতো গলার সুরও কেঁদে কেঁদে ক্ষয় হয়ে গেছে।
ঠিক একইভাবে, লালচান মিয়া তাঁর পরিবারকে নিয়ে অভাবের সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন। পর পর দুবছর বন্যা ও খরায় তাঁর বর্গা জমিতে ফসল ফলেনি, পরিবারকে দুবেলা পেট ভরে খেতে দিতে পারেন না, সন্তানরা হাড্ডিসার, আর তাঁর একমাত্র মাটির ঘরের ছাউনিও নষ্ট হওয়ার উপক্রম।
এখানে উল্লিখিত 'অভাব যেন পিছু ছাড়ে না' কথাটি নির্দেশ করছে যে, অভাব এইসব মানুষের জীবনে একটি স্থায়ী অবস্থা। আসমানিরা যেমন অনাহারে, অসুস্থতায় ও কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে, তেমনি লালচান মিয়া ও তাঁর পরিবারও একই ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। তাদের সংগ্রাম শুধু খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য, আর এই দারিদ্র্য তাদের জীবনকে এমনভাবে গ্রাস করে রেখেছে যে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় তারা পায় না। এক অভাব আরেক অভাবকে ডেকে আনে, ফলে অভাবের চক্র চলতেই থাকে। তাই বলা যায়, 'আসমানি' কবিতার আলোকে লালচান মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন সত্যিই পিছু ছাড়ে না।